“বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে গবেষণা চালানো বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।”
শিক্ষা আইনের খসড়া: শাস্তি নিষিদ্ধ, ধীরে ধীরে কোচিং-গাইড-টিউশনি বন্ধ
দেশে নতুনভাবে শিক্ষার আইন তৈরি করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে, যা কার্যকর হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষকদের টিউশনি, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও নোট গাইড “স্থায়ীভাবে” বন্ধ করা হবে।
এখন যে খসড়াটি আছে, তাতে বলা হয়েছে, নতুন আইন চালু হলে সরকার কোচিং সেন্টার, নোট গাইড ও ব্যক্তিগত টিউশনি “নিয়ন্ত্রণে” ব্যবস্থা নেবে এবং সংশ্লিষ্টদের সময়ে সময়ে নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে তিন বছরের মধ্যে এসব নবীকরণ করবে।
এছাড়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি দেওয়া এবং মানসিক চাপ দেওয়া নিষিদ্ধ করার কথাও বলা হয়েছে। তবে ‘স্বার্থ বিবেচনায়’ এবং ‘শৃঙ্খলা বজায় রাখার’ জন্য যেকোনো যুক্তিসঙ্গত কারণে শিক্ষকেরা কিছু নিয়ম-কানুন অনুসরণ করতে পারবেন বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
রোববার রাতে শিক্ষা আইন খসড়া ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে এবং মতামত চাওয়া হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫টার মধ্যে মতামত দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে ই-মেইলে।
জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্মসচিব (নিরীক্ষা ও আইন অনুবিভাগ) জহিরুল ইসলাম সোমবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন, “সবার মতামত সংগ্রহ করার পর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার মাধ্যমে খসড়া আইনটি চূড়ান্ত করা হবে। এরপর এটি ধাপে ধাপে মন্ত্রিসভার সামনে উপস্থাপন করা হবে।”
২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ের পর শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছরে এটি বাস্তবায়িত হয়নি।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইনের খসড়াটি একাধিকবার চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছিল। মন্ত্রিসভার বৈঠকে কয়েকবার উপস্থাপন হলেও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের কারণে তা বরাবরই ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অতীতে ২০১৮ সালে শিক্ষা আইন খসড়া মন্ত্রিপরিষদে পাঠানোর সময় শিক্ষা সম্পর্কিত সব আইন একত্রিত করে নতুন আইনের খসড়া তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল মন্ত্রিসভা থেকে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিক্ষা আইনের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছিল।
বর্তমানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করতে কোনো নির্দিষ্ট আইন কার্যকর নেই। তবে ২০১১ সালের ২১ এপ্রিল একটি পরিপত্র প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে এর পরেও শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তির অভিযোগ উঠে।
শিক্ষা আইনের খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো শিক্ষক কোনো শিক্ষার্থীকে শারীরিক শাস্তি দিতে বা মানসিক চাপ দেওয়ার অধিকার রাখবেন না। এই বিধান লঙ্ঘন হলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।
তবে শিক্ষার্থীর কল্যাণের কারণে অথবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার স্বার্থে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের যুক্তিসঙ্গত ও মানবিক শৃঙ্খলার অধিকার দিতে পারবেন। সেই ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের বিষয়টি জানানো যাবে।
খসড়া আইনে উল্লেখ আছে, আইন বাস্তবায়নের তিন বা পাঁচ বছরের মধ্যে কোচিং সেন্টার স্থাপন এবং সহায়ক বই (নোট বা গাইড বই) প্রকাশ করা বন্ধের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। তার আগে এসব কার্যক্রম ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বন্ধের ব্যবস্থা করা হবে।
খসড়া আইনে প্রাথমিক শিক্ষা প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ অনুযায়ী প্রাথমিক স্তর প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল। খসড়ায় সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে এবং এটি শিশুদের অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিকে মধ্যস্তরের শিক্ষা হিসেবে গণ্য করা হবে, আর একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি হবে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর। মাধ্যমিক শিক্ষায় তিনটি শাখা থাকবে—সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি থাকবে মাদ্রাসা শিক্ষা ও কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা।
কওমি শিক্ষার ক্ষেত্রে খসড়ায় বলা হয়েছে যে, সরকার কওমি মাদ্রাসার শিক্ষামান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
শিক্ষা আইন-২০২৬ কার্যকর করার জন্য একটি জাতীয় শিক্ষা অ্যাকাডেমি গঠন করার পরিকল্পনার কথা খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে। এই অ্যাকাডেমি শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, শিক্ষা গবেষণা, উদ্ভাবন, নীতিগত সহায়তা প্রদান, পাঠ্যক্রম মূল্যায়ন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের পরামর্শ সরকারকে প্রদান করবে।
এছাড়াও খসড়া আইনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকারের নির্দেশনা অনুসারে যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া) পরিদর্শন ও তদারকি করা যাবে না, পরিচালনা কমিটির পাঠদান ও ব্যবস্থাপনায় কোনও হস্তক্ষেপ করা হবে না, প্রযুক্তিগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি মেলার আয়োজন করা হবে, মাতৃভাষার সঙ্গে ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা পরিচিতি নম্বর চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
আইনের খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর শিক্ষকদের স্ব-স্ব ক্ষেত্রে গবেষণা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া, সরকারি উদ্যোগে একটি কেন্দ্রীয় গবেষণাগার ও জাতীয় গবেষণা পরিষদ গঠন করার কথা বলা হয়েছে।
পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, সৎ সাহস ও দেশপ্রেমের উদ্বুদ্ধকরণ, সামাজিক ও ধর্মীয় চেতনা এবং নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সন্নিবেশ করার বিষয়গুলো খসড়া আইনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব ফুটে উঠেছে।
