৬১ বছর আগে এইদিনে ফুটবল জাদুকর সামাদ বিদায় নেন। উপমহাদেশের ফুটবলের একটি অতুলনীয় তাৎপর্য। একই দিনে ক্রীড়াঙ্গনের আরেকটি রত্ন রণজিৎ দাসও চলে যান। যদিও তাঁদের অবস্থান ছিল ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে। সামাদ ছিলেন আক্রমণভাগের ভয়ঙ্কর খেলোয়াড় আর রণজিৎ ছিলেন রক্ষণের সজাগ পাহারাদার।
সামাদের খেলার আসর প্রধানত অখণ্ড ভারতের কলকাতা হলেও রণজিৎ দেশভাগের পর মূলত ঢাকায় নিজের দক্ষতা বাড়ান। এর পাশাপাশি, দুই প্রজন্মের এই দুই ক্রীড়াব্যক্তিত্বের মধ্যে একটি সংযোগ গড়ে উঠেছিল। রণজিৎ ফুটবলের শিক্ষায় সোমাদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
১৯৫৭ সালে পাকিস্তান স্পোর্টস কন্ট্রোল বোর্ডের উদ্যোগে ঢাকায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচিত ত্রিশজন ফুটবলারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, যাদের এক ব্যক্তি ছিলেন রণজিৎ। এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির তত্ত্বাবধানে ছিলেন স্পোর্টস কন্ট্রোল বোর্ডের প্রধান কোচ সামাদ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সোনালী যুগের খেলোয়াড় আবদুস সাত্তার, হাফেজ রশীদ, খন্দকার নাসিম, এস এম ইয়াসিন, শাহজাহান ও আলাউদ্দীন।
এক মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ শিবিরে প্রতিদিন চার ঘন্টা মাঠে কাজ এবং এক ঘন্টা তাত্ত্বিক ক্লাস অনুষ্ঠিত হত। এর ফলে ফুটবলাররা উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হন। সেই অনুযায়ী, ওই বছর অষ্টম জাতীয় ন্যাশনাল ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে প্রথমবারের মতো পূর্ব পাকিস্তানের একটি দল পৌঁছায়। ভয়াবহ পাঞ্জাবের কাছে ২-১ গোলে পরাজিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান হোয়াইট দল রানার্সআপ হয়। এই প্রতিযোগিতায় রণজিৎ দাস অসাধারণ খেলা প্রদর্শন করেছিলেন।
সামাদ এবং রণজিৎ দাসের মতো ক্রীড়াব্যক্তিত্বরা শুধুমাত্র খেলার মাঠকে আলোকিত করেন না, তারা প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষের মধ্যে উদ্দীপনার মশাল প্রজ্জ্বলিত করে রাখেন। রণজিতের খেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ হয়নি, তবে তাঁর সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য হয়েছিল। কত অজানা তথ্য জানতে পেরেছি। তিনি শুনতে কিছুটা অসুবিধাগ্রস্ত ছিলেন, কিন্তু একবার উনাকে উসকে দিলেই ব্যাপারটি হয়ে যেত।
দৈনিক পাকিস্তানে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে আতিকুল্লাহ হকি প্রতিযোগিতায় যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ন্যাশনাল ব্যাংক দলের গোলরক্ষক হিসেবে রণজিৎ দাসও উপস্থিত আছেন। রণজিৎ দাসের অ্যালবামে অনন্যায় স্মৃতি ছিল। আমি সাধারণত যতটা সম্ভব ক্রীড়াবিদদের কাছ থেকে তথ্য সঠিকভাবে মিলিয়ে আনার চেষ্টা করি। অনেক সময় তথ্যগুলোতে গরমিল পাওয়া যায়। কিন্তু রণজিৎ দাসের তথ্য ছিল সম্পূর্ণ নির্ভুল। বয়স তাঁর স্মৃতিকে দীন করেনি। পুরনো স্মৃতিগুলোর কথা উল্লেখ করে তিনি অবিকৃতভাবে সেটি বলতেন।
যে সমস্ত লোক তাঁকে জানতেন, তারা জানেন যে তিনি ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন অমায়িক, সদালাপী এবং বন্ধুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে তিনি বহু মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল একেবারেই কঠিন, দৃঢ় এবং অনমনীয়। যেকোনো চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় নিজেকে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিতে তিনি কখনো কার্পণ্য করতেন না।
আরও পড়ুন
চিরনিদ্রায় ‘টেলিগ্রাম যুগের’ সেই শেষ নায়ক: মাঠের ধুলা ছেড়ে অনন্তলোকে রণজিৎ দাস
১২ ঘণ্টা আগে
চিরনিদ্রায় ‘টেলিগ্রাম যুগের’ সেই শেষ নায়ক: মাঠের ধুলা ছেড়ে অনন্তলোকে রণজিৎ দাস
১৯৫৪ সালে ঘটে। হবিগঞ্জের ইউনাইটেড ফ্রেন্ডস ক্লাবের পক্ষে রণজিৎ দাস খেলতে আসেন। ফাইনাল খেলার প্রতিপক্ষ হবিগঞ্জ টাউন ক্লাব। ঢাকা, কুমিল্লা ও হবিগঞ্জের সেরা খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে গঠিত টাউন ক্লাবটি শক্তিশালী ছিল। এর তুলনায় ফ্রেন্ডস ক্লাব ছিল দুর্বল। ঘটনাক্রমে তিনি টাউন ক্লাবের তীব্র সমর্থকদের বাড়িতে অবস্থান করেন। তাঁকে নিয়ে সেখানে মজা-ইয়ার্কি করা হয়। তাঁর ঘরের সামনে জুতোর মালা ঝুলিয়ে লেখা হয়, ‘পরাজিত গোলকিপারের জন্য’।
এ ঘটনায় তিনি অসম্মানিত অনুভব করেন। এর সঠিক প্রতিক্রিয়া জানাতে তিনি মন থেকে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। বিশাল সংখ্যক দর্শকের সামনে টাউন ক্লাবের ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের দারুণ ফরোয়ার্ড বলাই দাস একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকেন। রনজিৎ যেভাবে একাধিকবার তাঁর পা থেকে বল ছিনিয়ে নেন, তাতে মাঠের দর্শকরা বিস্মিত হয়ে যান। বলাই হতাশ হয়ে পড়েন। শেষ বাঁশি বাজার কিছু ক্ষণ আগে একটি গোল করে ফ্রেন্ডস ক্লাব বিজয়ী হয়।
খেলোয়াড়ি জীবনে রণজিৎ দাস
খেলোয়াড়ি জীবনে রণজিৎ দাসের অ্যালবাম থেকে
দর্শকেরা তাঁকে কাঁধে তুলে আনন্দে মাতেন। নিজের ঘরে ফিরে তিনি দেখতে পান, যেখানে জুতার মালা ছিল, সেখানে ফুলের মালা সংযুক্ত রয়েছে। তাতে লেখা রয়েছে ‘বিজয়ী গোলকিপারের জন্য’।
এই ম্যাচে অবিশ্বাস্য পারফরমেন্সের পর আগরতলার মার্চেন্ট ক্লাবের পক্ষ থেকে রণজীতকে এক ম্যাচে খেলতে নির্বাচিত করা হয়। ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের বাড়িতে তাঁর জন্য থাকার এবং খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সেই সময় বাড়িতে একজন অতিথি আসেন। তিনি রণজিতের নাম জানতে পেরেই প্রশ্ন করেন, রণজিৎ কি সংগীত পরিচালক সুবল দাসের ভাই? সুবল দাস ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের গোলরক্ষক ছিলেন। উত্তর না পাওয়ার পর অতিথিটি রণজীতকে বলেন, ‘মাঠ থেকে গোল নিয়ে আসার জন্য তুমি ১২টি থলে নিয়ে যেয়ো। ১১টি তোমাদের ১১ জনের জন্য এবং অপরটি ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের জন্য।’

